• +880-1713-4833-96
  • ramfitac@gmail.com

Compiled by RAMFIT July 25, 2026 242
Featured Image

আলহামদুলিল্লাহ। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক রাসূলুল্লাহ ﷺ, তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবায়ে কেরামের ওপর।

সন্তান জন্মদান আল্লাহ তাআলার এক মহান নিয়ামত। ইসলামে মানুষের জীবন (حفظ النفس), বংশধারা (حفظ النسل), মানবদেহের পবিত্রতা (Hurmah al-Insān) এবং মানুষের মর্যাদা (Karāmah al-Insān) সংরক্ষণ শরীয়তের (Maqāṣid al-Sharī‘ah) অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। এ কারণে সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে এমন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে, যা মা ও সন্তানের জন্য সর্বাধিক নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূল্যায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

"তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।" (সূরা আল-বাকারা, ২:১৯৫)

আরও বলেন—

"আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান; তিনি তোমাদের জন্য কঠিনতা চান না।" (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৫)

এবং বলেন—

"তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা আরোপ করেননি।" (সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৭৮)

এছাড়াও আল্লাহ তাআলা বলেন—

"নিশ্চয়ই আমি আদমসন্তানকে মর্যাদাবান করেছি।" (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৭০)

এসব দলিলের ভিত্তিতে ফকীহগণ কয়েকটি মৌলিক নীতি নির্ধারণ করেছেন।

الضرر يزال ক্ষতি দূর করা হবে।

الضرورات تبيح المحظورات অপরিহার্য প্রয়োজন সীমিত পরিসরে নিষিদ্ধ বিষয়কেও বৈধ করে।

المشقة تجلب التيسير অসহনীয় কষ্ট শরীয়তে সহজীকরণের কারণ হয়।

إذا تعارضت مفسدتان روعي أعظمهما ضرراً بارتكاب أخفهما দুটি ক্ষতির মধ্যে একটিকে গ্রহণ করতে হলে বৃহত্তর ক্ষতি এড়াতে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতি গ্রহণ করা হবে।

চিকিৎসাগত প্রয়োজন হলে সিজার (C-Section)

যদি দক্ষ, বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ প্রসূতি বিশেষজ্ঞের মূল্যায়নে স্বাভাবিক প্রসব মা বা সন্তানের জন্য উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়, তাহলে সিজার করা সম্পূর্ণ শরয়তসম্মত। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা ওয়াজিবের পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে, কারণ জীবন রক্ষা শরীয়তের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

এর মধ্যে রয়েছে—

• Placenta previa 
• Placental abruption 
• Fetal distress 
• Obstructed labour 
• Cord prolapse 
• Uterine rupture-এর উচ্চ ঝুঁকি 
• গুরুতর Pre-eclampsia বা Eclampsia 
• শিশুর অস্বাভাবিক অবস্থান (Transverse lie ইত্যাদি) 
• পূর্ববর্তী জটিল জরায়ুর অস্ত্রোপচার 
• অথবা বিশ্বস্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বিবেচনায় অন্য যেকোনো উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা।

এ ধরনের অবস্থায় সিজারিয়ান নির্বাচন করা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়; বরং শরয়তসম্মত উপায়ে জীবন রক্ষার চেষ্টা।

Tokophobia, Severe Anxiety ও Previous Birth Trauma-এর ক্ষেত্রে

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সব "ভয়" এক রকম নয়। সাধারণ প্রসববেদনার আশঙ্কা (ordinary fear of labour pain) এবং Tokophobia (pathological fear of childbirth) এক বিষয় নয়।

Tokophobia এমন একটি স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা, যেখানে প্রসবের ভয় এতটাই তীব্র হতে পারে যে তা মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য, দৈনন্দিন জীবন, চিকিৎসা গ্রহণ এবং কখনো কখনো গর্ভাবস্থার নিরাপত্তাকেও গুরুতরভাবে প্রভাবিত করে। একইভাবে পূর্ববর্তী প্রসবে গুরুতর ট্রমা (Previous Traumatic Birth), Post-traumatic Stress Disorder (PTSD) বা Severe Anxiety Disorder-এর ক্ষেত্রেও বিষয়টি আলাদাভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন হয়।

বর্তমান আন্তর্জাতিক গাইডলাইন (যেমন NICE ও RCOG) এ ধরনের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত ধাপ অনুসরণের পরামর্শ দেয়—

• বিস্তারিত ইতিহাস গ্রহণ ও Shared Decision-Making। 
• Perinatal Mental Health Team, Obstetrician, Midwife ও Clinical Psychologist-এর সমন্বিত মূল্যায়ন। 
• উপযুক্ত Counselling, Psychological Support, Birth Planning এবং Labour Pain Management-এর ব্যবস্থা। 
• এসব ব্যবস্থা গ্রহণের পরও যদি Tokophobia বা গুরুতর মানসিক কষ্ট অব্যাহত থাকে এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ মনে করেন যে Planned Caesarean Section-ই মা ও সন্তানের জন্য অধিক নিরাপদ বিকল্প, তাহলে Maternal Request Caesarean Section (MRCS) গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

অর্থাৎ—

"ভয় আছে, তাই সিজার"—এমন নয়।

আবার—

"কখনোই ভয়ের কারণে সিজার করা যাবে না"—এটিও গাইডলাইনের বক্তব্য নয়।

সিদ্ধান্তটি রোগীভেদে, বিশেষজ্ঞ মূল্যায়নের ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়।

শরীয়তের আলোকে

ইসলামে মানসিক ক্ষতিকেও (psychological harm) ক্ষতির অন্তর্ভুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যদি তা বাস্তব, গুরুতর এবং বিশ্বস্ত বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।

অতএব যদি বিশ্বস্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মূল্যায়নে Tokophobia, PTSD বা Severe Anxiety এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে তা মা বা সন্তানের জন্য বাস্তব ক্ষতির আশঙ্কা সৃষ্টি করছে এবং যথাযথ চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের পরও Planned Caesarean Section-ই নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতেও তা চিকিৎসাগত প্রয়োজন (حاجة معتبرة) হিসেবে গণ্য হতে পারে।

সেক্ষেত্রে সিজার করা জায়েজ, কারণ উদ্দেশ্য হলো বাস্তব ক্ষতি প্রতিরোধ করা; কেবল ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জন করা নয়।

চিকিৎসাগত কারণ ছাড়া পরিকল্পিত সিজার (C-Section)

যদি কোনো চিকিৎসাগত বা স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্যগত কারণ না থাকে, কেবল—

• সাধারণ প্রসববেদনার ভয় 

• নির্দিষ্ট তারিখ বা শুভ সময় নির্বাচন 

• পারিবারিক সুবিধা 

• সামাজিক চাপ 

• ব্যক্তিগত পছন্দ

—এসব কারণে সিজার করানো শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ নয়।কারণ সিজার একটি বড় অস্ত্রোপচার। এর সঙ্গে রক্তক্ষরণ, ইনফেকশন, অ্যানেসথেশিয়ার জটিলতা, দীর্ঘ পুনরুদ্ধার, ভবিষ্যৎ গর্ভধারণে Placenta Accreta Spectrum, Uterine Rupture, Adhesion, Bowel/Bladder Injury-সহ বিভিন্ন ঝুঁকি জড়িত।

 

হুরমাহ (حُرْمَة) — মানবদেহের পবিত্রতা

ইসলামে মানুষের দেহ আল্লাহ তাআলার আমানত। তাই শরীয়ত মানবদেহে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ, অযথা কাটা-ছেঁড়া বা ঝুঁকি সৃষ্টি সমর্থন করে না। যখন চিকিৎসাগতভাবে নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব, তখন বৈধ কারণ ছাড়া বড় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দেহে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করা Hurmah al-Insān-এর পরিপন্থী।

তবে যখন জীবন, অঙ্গ বা গুরুতর শারীরিক কিংবা মানসিক ক্ষতি প্রতিরোধের জন্য অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়, তখন একই শরীয়ত সেই অস্ত্রোপচারকেই বৈধ—এমনকি কখনো আবশ্যক—ঘোষণা করে।
 

কারামাহ (كَرَامَة) — মানুষের মর্যাদা

আল্লাহ তাআলা আদমসন্তানকে সম্মানিত করেছেন। মানুষের এই মর্যাদার অন্যতম দাবি হলো—

তাকে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট, ঝুঁকি কিংবা চিকিৎসাগতভাবে অযৌক্তিক অস্ত্রোপচারের মধ্যে ঠেলে দেওয়া যাবে না।

অন্যদিকে যখন সিজারিয়ানই মা ও সন্তানের জীবন ও সুস্থতা রক্ষার সর্বোত্তম উপায়, তখন সেই সিজারিয়ানই মানুষের মর্যাদা (Karāmah) সংরক্ষণের অংশ।

 

চিকিৎসকের দায়িত্ব

চিকিৎসকের মৌলিক দায়িত্ব হলো রোগীর সর্বোত্তম কল্যাণ নিশ্চিত করা; অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার করে আর্থিক লাভ অর্জন করা নয়।

যেসব রোগীকে অস্ত্রোপচার ছাড়াও নিরাপদ ও কার্যকরভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব, তাদেরকে অপারেশনের পরামর্শ দেওয়া বা অপারেশনে সম্মত করানো শরয়ীভাবে বৈধ নয়।

যদি কোনো সার্জন অধিক পারিশ্রমিক বা ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব হওয়া সত্ত্বেও অপ্রয়োজনীয় সিজারের পরামর্শ দেন বা অপারেশন করেন, তবে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে জুলুম, খিয়ানত এবং গুরুতর গুনাহ।
 

সমসাময়িক ফতোয়া

Shaykh Yusuf Badat (IslamQA.org – Hanafi) বলেন, চিকিৎসাগত প্রয়োজন থাকলে Elective Caesarean Section বৈধ। কিন্তু চিকিৎসাগত কারণ ছাড়া কেবল প্রসববেদনার ভয়ে সিজার সমর্থনযোগ্য নয়।

Shaykh Muhammad Ṣāliḥ al-Munajjid-এর তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত IslamQA.info-এর ফতোয়ায় বলা হয়েছে, মূলনীতি হলো স্বাভাবিক প্রসব। তবে বিশ্বস্ত চিকিৎসক যদি মনে করেন যে মা বা শিশুর নিরাপত্তার জন্য সিজার প্রয়োজন, তাহলে তা বৈধ; বরং প্রয়োজনীয় হতে পারে।

IslamWeb (Fatwa No. 105251)-এ বলা হয়েছে, সন্তান প্রসবের পদ্ধতি নির্ধারণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করবে। চিকিৎসাগত প্রয়োজন থাকলে সিজার বৈধ। কিন্তু চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া কেবল সুবিধার জন্য সিজার করানো عدم الجواز (জায়েজ নয়); কারণ এতে অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি বিদ্যমান।

Assembly of Muslim Jurists of America (AMJA)-এর সমসাময়িক মেডিকেল-ফিকহ আলোচনাতেও একই নীতি অনুসৃত হয়েছে—চিকিৎসাগত প্রয়োজন হলে অস্ত্রোপচার বৈধ; তবে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার পরিহার করতে হবে।

মাওলানা মুফতি ইকবাল হুসাইন সাবরী (রহ.) তাঁর "سرجری اور آپریشن کے شرعی احکام" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, যেসব রোগীর অস্ত্রোপচার ছাড়াই চিকিৎসা সম্ভব, তাদের ক্ষেত্রে অপারেশন করা বা করানো বৈধ নয়। তিনি আরও বলেন, অধিক অর্থ উপার্জনের আশায় অপ্রয়োজনীয় সিজার করা শরীয়তের দৃষ্টিতে সুস্পষ্ট জুলুম ও গুনাহ।

 

সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানকারী মায়ের মর্যাদা

চিকিৎসাগত প্রয়োজনবশত সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানকারী মা কোনোভাবেই স্বাভাবিক প্রসবকারী মায়ের তুলনায় কম মর্যাদা বা কম সওয়াবের অধিকারী নন।

আল্লাহ তাআলা বান্দার নিয়ত, ধৈর্য, কষ্ট ও ত্যাগ অনুযায়ী প্রতিদান প্রদান করেন।

সারসংক্ষেপ

  1. চিকিৎসাগত প্রয়োজন হলে সিজারিয়ান বৈধ; বরং অনেক ক্ষেত্রে ওয়াজিবও হতে পারে।
  2. Tokophobia, Previous Birth Trauma, PTSD বা Severe Anxiety-এর মতো গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থায় বিশ্বস্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মূল্যায়নে যদি Planned Caesarean Section-ই নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে তা চিকিৎসাগত প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে এবং শরীয়তের দৃষ্টিতেও বৈধ।
  3. চিকিৎসাগত বা স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্যগত কারণ ছাড়া কেবল ব্যক্তিগত সুবিধা, সাধারণ প্রসববেদনার ভয়, শুভ দিন নির্বাচন বা সামাজিক কারণে সিজারিয়ান করানো জায়েজ নয়।
  4. মানবদেহের Hurmah (পবিত্রতা) এবং মানুষের Karāmah (মর্যাদা) অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার থেকে দেহকে রক্ষা করার দাবি করে; তবে প্রকৃত প্রয়োজন দেখা দিলে একই নীতিমালা জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষার্থে অস্ত্রোপচারকে বৈধতা দেয়।
  5. চিকিৎসকের জন্য অর্থলাভ বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের পরামর্শ দেওয়া বা তা সম্পাদন করা হারাম ও জুলুমস্বরূপ।
  6. সন্তান প্রসবের পদ্ধতি নির্ধারণে আবেগ, সামাজিক চাপ বা ব্যক্তিগত সুবিধার পরিবর্তে বিশ্বস্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মূল্যায়ন এবং শরীয়তের নীতিমালাকেই অনুসরণ করতে হবে।

والله تعالى أعلم بالصواب
 

তথ্যসূত্র

১. IslamQA.org (Hanafi) — Elective C-Section for Childbirth (Shaykh Yusuf Badat) 

২. IslamQA.info — Ruling on Caesarean Section when there is no medical need 

৩. IslamWeb — Fatwa No. 105251: حكم الولادة القيصرية بدون حاجة 

৪. Assembly of Muslim Jurists of America (AMJA) — Contemporary Medical Fiqh Discussions on Obstetric Interventions 

৫. SeekersGuidance — Do Mothers Who Give Birth Through C-Section Have a Lesser Reward? 

৬. মাওলানা মুফতি ইকবাল হুসাইন সাবরী (রহ.), سرجری اور آپریشن کے شرعی احكام, পৃ. ৪০; ১৯৬–১৯৭। 

৭. NICE Guideline NG192. Caesarean Birth (Updated 2024) – Maternal request for caesarean birth, including tokophobia and previous birth trauma. 

৮. RCOG Scientific Impact Paper No. 68. Caesarean Birth on Maternal Request (2022).

 

 

RAMFIT