প্রয়োজন, মানসিক স্বাস্থ্য, চিকিৎসকের দায়িত্ব, মানবদেহের হুরমাহ ও মানুষের কারামাহ—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে একটি সম্পূর্ণ নীতিগত আলোচনা।
আলহামদুলিল্লাহ। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক রাসূলুল্লাহ ﷺ, তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবায়ে কেরামের ওপর। সন্তান জন্মদান আল্লাহ তাআলার এক মহান নিয়ামত। ইসলামে মানুষের জীবন (حفظ النفس), বংশধারা (حفظ النسل), মানবদেহের পবিত্রতা (Hurmah al-Insān) এবং মানুষের মর্যাদা (Karāmah al-Insān) সংরক্ষণ শরীয়তের (Maqāṣid al-Sharī‘ah) অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। এ কারণে সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে এমন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে, যা মা ও সন্তানের জন্য সর্বাধিক নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূল্যায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
০১
﴿ وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ ﴾
"তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।"
সূরা আল-বাকারা, ২:১৯৫
﴿ يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ ﴾
"আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান; তিনি তোমাদের জন্য কঠিনতা চান না।"
সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৫
﴿ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ ﴾
"তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা আরোপ করেননি।"
সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৭৮
﴿ وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ ﴾
"নিশ্চয়ই আমি আদমসন্তানকে মর্যাদাবান করেছি।"
সূরা আল-ইসরা, ১৭:৭০
এসব দলিলের ভিত্তিতে ফকীহগণ কয়েকটি মৌলিক নীতি নির্ধারণ করেছেন —
০২
যদি দক্ষ, বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ প্রসূতি বিশেষজ্ঞের মূল্যায়নে স্বাভাবিক প্রসব মা বা সন্তানের জন্য উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়, তাহলে সিজার করা সম্পূর্ণ শরয়তসম্মত। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা ওয়াজিবের পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে, কারণ জীবন রক্ষা শরীয়তের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
এর মধ্যে রয়েছে
এ ধরনের অবস্থায় সিজারিয়ান নির্বাচন করা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়; বরং শরয়তসম্মত উপায়ে জীবন রক্ষার চেষ্টা।
০৩
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো — সব "ভয়" এক রকম নয়। সাধারণ প্রসববেদনার আশঙ্কা (ordinary fear of labour pain) এবং Tokophobia (pathological fear of childbirth) এক বিষয় নয়।
Tokophobia এমন একটি স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা, যেখানে প্রসবের ভয় এতটাই তীব্র হতে পারে যে তা মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য, দৈনন্দিন জীবন, চিকিৎসা গ্রহণ এবং কখনো কখনো গর্ভাবস্থার নিরাপত্তাকেও গুরুতরভাবে প্রভাবিত করে। একইভাবে পূর্ববর্তী প্রসবে গুরুতর ট্রমা (Previous Traumatic Birth), Post-traumatic Stress Disorder (PTSD) বা Severe Anxiety Disorder-এর ক্ষেত্রেও বিষয়টি আলাদাভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন হয়।
বর্তমান আন্তর্জাতিক গাইডলাইন — NICE ও RCOG
১
বিস্তারিত ইতিহাস গ্রহণ ও Shared Decision-Making।
২
Perinatal Mental Health Team, Obstetrician, Midwife ও Clinical Psychologist-এর সমন্বিত মূল্যায়ন।
৩
উপযুক্ত Counselling, Psychological Support, Birth Planning এবং Labour Pain Management-এর ব্যবস্থা।
৪
এসব ব্যবস্থা গ্রহণের পরও যদি Tokophobia বা গুরুতর মানসিক কষ্ট অব্যাহত থাকে এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ মনে করেন যে Planned Caesarean Section-ই মা ও সন্তানের জন্য অধিক নিরাপদ বিকল্প, তাহলে Maternal Request Caesarean Section (MRCS) গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
✕
"ভয় আছে, তাই সিজার" — এমন নয়।
✕
"কখনোই ভয়ের কারণে সিজার করা যাবে না" — এটিও গাইডলাইনের বক্তব্য নয়।
সিদ্ধান্তটি রোগীভেদে, বিশেষজ্ঞ মূল্যায়নের ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়।
শরীয়তের আলোকে
ইসলামে মানসিক ক্ষতিকেও (psychological harm) ক্ষতির অন্তর্ভুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যদি তা বাস্তব, গুরুতর এবং বিশ্বস্ত বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।
অতএব যদি বিশ্বস্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মূল্যায়নে Tokophobia, PTSD বা Severe Anxiety এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে তা মা বা সন্তানের জন্য বাস্তব ক্ষতির আশঙ্কা সৃষ্টি করছে এবং যথাযথ চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের পরও Planned Caesarean Section-ই নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতেও তা চিকিৎসাগত প্রয়োজন (حاجة معتبرة) হিসেবে গণ্য হতে পারে।
সেক্ষেত্রে সিজার করা জায়েজ, কারণ উদ্দেশ্য হলো বাস্তব ক্ষতি প্রতিরোধ করা; কেবল ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জন করা নয়।
০৪
যদি কোনো চিকিৎসাগত বা স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্যগত কারণ না থাকে, কেবল —
— এসব কারণে সিজার করানো শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ নয়। কারণ সিজার একটি বড় অস্ত্রোপচার। এর সঙ্গে বিভিন্ন ঝুঁকি জড়িত —
০৫
ইসলামে মানুষের দেহ আল্লাহ তাআলার আমানত। তাই শরীয়ত মানবদেহে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ, অযথা কাটা-ছেঁড়া বা ঝুঁকি সৃষ্টি সমর্থন করে না। যখন চিকিৎসাগতভাবে নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব, তখন বৈধ কারণ ছাড়া বড় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দেহে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করা Hurmah al-Insān-এর পরিপন্থী।
তবে যখন জীবন, অঙ্গ বা গুরুতর শারীরিক কিংবা মানসিক ক্ষতি প্রতিরোধের জন্য অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়, তখন একই শরীয়ত সেই অস্ত্রোপচারকেই বৈধ — এমনকি কখনো আবশ্যক — ঘোষণা করে।
আল্লাহ তাআলা আদমসন্তানকে সম্মানিত করেছেন। মানুষের এই মর্যাদার অন্যতম দাবি হলো — তাকে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট, ঝুঁকি কিংবা চিকিৎসাগতভাবে অযৌক্তিক অস্ত্রোপচারের মধ্যে ঠেলে দেওয়া যাবে না।
অন্যদিকে যখন সিজারিয়ানই মা ও সন্তানের জীবন ও সুস্থতা রক্ষার সর্বোত্তম উপায়, তখন সেই সিজারিয়ানই মানুষের মর্যাদা (Karāmah) সংরক্ষণের অংশ।
০৬
চিকিৎসকের মৌলিক দায়িত্ব হলো রোগীর সর্বোত্তম কল্যাণ নিশ্চিত করা; অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার করে আর্থিক লাভ অর্জন করা নয়। যেসব রোগীকে অস্ত্রোপচার ছাড়াও নিরাপদ ও কার্যকরভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব, তাদেরকে অপারেশনের পরামর্শ দেওয়া বা অপারেশনে সম্মত করানো শরয়ীভাবে বৈধ নয়।
! যদি কোনো সার্জন অধিক পারিশ্রমিক বা ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব হওয়া সত্ত্বেও অপ্রয়োজনীয় সিজারের পরামর্শ দেন বা অপারেশন করেন, তবে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে জুলুম, খিয়ানত এবং গুরুতর গুনাহ।
০৭
YB
IQ
IW
AM
IH
০৮
চিকিৎসাগত প্রয়োজনবশত সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানকারী মা কোনোভাবেই স্বাভাবিক প্রসবকারী মায়ের তুলনায় কম মর্যাদা বা কম সওয়াবের অধিকারী নন।
আল্লাহ তাআলা বান্দার নিয়ত, ধৈর্য, কষ্ট ও ত্যাগ অনুযায়ী প্রতিদান প্রদান করেন।
০৯
১০