আধোঘুম জাগরণে আবছাভাবে গ্র‍্যান্ডফাদার ক্লকটার ভেসে আসা পাঁচবার ঢং ঢং আওয়াজ কানে আসতেই আতিকা উঠে বসে। মোবাইলের অ্যালার্মটা বাজলো না কেন? ইশশ, আজকেও ভাইয়ার আগে উঠা গেল না। মায়ের ঘর থেকে গুণগুণিয়ে কুরআন পড়ার শব্দ ভেসে আসছে।  কিন্তু ভাইয়ার রুমের দরজার দিকে তাকাতেই মনটা খুশিতে ভরে গেল, এখনো দরজার নিচটা অন্ধকার, আবীর ঘুমেই মগ্ন।

বিড়ালের মত নিঃশব্দে দরজার পাশে গিয়ে জোরে হাক দিল,  

রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী,
এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে…

কথা শেষ করতে পারল না আতিকা,  ভেতর থেকে আবিরের গমগমে কন্ঠ ভেসে আসল, 

আমি যদি না জাগি তো কেমনে সকাল হবে?
তোমার ভাইয়া উঠলে জেগে রাত পোহাবে তবে!

জিভে কামড় দেয় আতিকা, ইশশ, আজকেও ভাইয়াকে হারাতে পারল না।  কন্ঠ শুনেই বুঝা যাচ্ছে, ঘুম থেকে সে অনেক আগেই উঠেছে। নিশ্চয় লাইট বন্ধ করে মুনাজাত করছিল।

– আফসোস করিস না, গিয়ে নামাজ পড়ে আয়,  আজ একটা কবিতা শোনাব নতুন।
আবির ও আতিকার এই কবিতার অভ্যাস এসেছে তার বাবার কাছ থেকে। বাবার কথায় কথায় বিপ্লব ও জাগরণ,  রম্য কবিতার খই ফুটত সবসময়। দেখা যেত, মা খেতে ডাকলেই বাবা জবাব দিতেন,

খাই খাই করো কেন, এসো বসো আহারে –
খাওয়াব আজব খাওয়া, ভোজ কয় যাহারে,
যত কিছু খাওয়া লেখে বাঙালীর ভাষাতে –
জড় করে আনি সব থাক সেই আশাতে…।

ক্যান্সারের শেষ স্টেজে যখন বাবা পৌছে গেলেন, বাবার আবৃত্তি থেমে গেল। ছেলে মেয়ের ভবিষ্যত চিন্তা তার ভোকাল কর্ডকে খামচে ধরেছিল হয়তো। ছেলেটা মাত্র মেডিকেলে চান্স পেয়েছে।  মেয়েটা এইচএসসি পরীক্ষার্থী।  এ অবস্থায় তাদেরকে রেখে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারছেন না বাবা।  

বাবা হুট করে একদিন ডেকে অনেক উপদেশ দিলেন। শেষে বললেন, 

ভূগোলটাকে ভেংগেচুরে নতুন করে গড়ো,
গড়ার জন্য ভেংগে ফেলা কাজটা অনেক বড়।

–  বাবা,  কারা ভাংবে?  কারা গড়বে?
–  জানিনা, মা,  শুধু জানি-

পাথরে পারদ জ্বলে,  জলে ভাংগে ঢেউ,
ভাংগতে ভাংগতে জানি গড়ে যাবে কেউ! 

বাবা চলে গেলেন। রেখে গেলেন কবিতার কলরোল।

 

নামাজ শেষ করে আবারো ভাইয়ার রুমে উকি দিল আতিকা। কীবোর্ডের খটখট আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে রুমজুড়ে। এই লকডাউনে আবীরের কর্মপরিধি দেখে অবাক হয়েছে আতিকা।  দিনভর হয় অনলাইনে কোন ক্লাস, কোর্স অথবা টাইপিং,  ভিডিও এডিটিং, ডিজাইন এগুলো নিয়েই ব্যাস্ত।  জিজ্ঞেস করলে একটাই উত্তর,  র‍্যামফিট। এই কথার উত্তরে কোন কবিতা থাকেনা। কেন থাকেনা সেটাও একটা প্রশ্ন!

তাই আবারো রুমে ঢুকে জিজ্ঞেস করে, ভাই, কি করছো? 
– র‍্যা….!
– জানি, কাজটা কি সেটা জানতে চাইছিলাম।
– এই ডিসেম্বরে একটা ওয়েবিনার হবে,  তার প্রস্তুতি।
– কদিন আগে একটা অনুষ্ঠান দেখিয়েছিলে,  সেরকম।
– হ্যা সেটাই।
– এবারের টপিক কি ভাইয়া?

Rulings on Seeking Treatment & Treating People!

– অ্যাঁ! কি আলোচনা হবে ওখানে?
– আবির সংবাদ পাঠকের ভংগিতে বলল,

“জানতে হলে চোখ রাখুন RAMFIT – এর ফেসবুক পেইজে ১৬ ই ডিসেম্বর রাত ৯ টায়!”

– আচ্ছা ভাই দেখা যাবে! শোন, আমি হোস্টেলে যাব, বইপত্র কিছু নিয়ে আসতে হবে।
– যা না নিজে নিজে,  অ্যাদ্দিন তো আমার পারমিশন লাগে নাই।  আজকে নিচ্ছিস যে বড়?
– সেদিন তোমাদের ওয়েবিনারে যে শুনলাম, মাহরাম ছাড়া সফর করা যায় না।
কীবোর্ডে আবীরের হাত তালগোল পাকিয়ে ফেলে।  এত গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস সে ভুলে গেল কেমনে।
– সরি, আচ্ছা কয়টায় যেতে হবে?
– দুপুর নাগাদ, আচ্ছা শোন ভাই, মাহরাম সাথে নেয়াটা কি আসলেই জরুরী? আমি তো আগে কতবার একা একা গিয়েছি!

ঘুমাইয়া কাজা করেছি ফজর,

তখনো জাগিনি যখন যোহর,

হেলা ও খেলায় কেটেছে আসর

মাগরিবের আজ শুনি আজান।

জামাত শামিল হওরে এশাতে

এখনো জমাতে আছে স্থান।

– মানে কি ভাই? আমি ক্বাজা করলাম কই?
– আরে আমি দায়িত্ব ক্বাজার কথা বুঝাইসি। এদ্দিন যে মাহরাম ছাড়া সফর করলি, তাই বলে এখনো করে যাবি নাকি? আগের ওয়াক্ত ক্বাজা হয়ে গেসে বলে এই ওয়াক্ত ক্বাজা করা যাবে এমন সিস্টেম কই পেলি তুই?
– তো এই যে হাজার হাজার মেয়ে একলা আসা যাওয়া করে,  তাদের বেলায়? অনেকে তো ট্যুরেও যায়।  মাহরাম তো দূরের কথা,  চারপাশ ভর্তি নন-মাহরাম।

আবির একটু নস্টালজিয়ায় ভুগতে শুরু করে,  সেও কি এমন হারামে লিপ্ত ছিল না আগে?  এভাবে একদিন তার চিন্তা ভাবনার জগতে আলোড়ন ঘটে যাবে সেটা ভাবতে পারেনি কখনো।  কবি ফররুখের কথাগুলো বাজে মনে,

“ঘুম ভাংগলো কি হে আলোর পাখি,  মহা নীলিমায় ভ্রাম্যমান

রাত্রি রুদ্ধ কন্ঠ হতে কি, ঝড়বে এবার দিনের গান?”

আতিকার তীক্ষ্ণ কন্ঠ বাস্তবে ফিরিয়ে আনে আবীরকে। সেই পুরনো প্রশ্ন আবার করে বসেছে।
– এগুলো শুনে অনেকেই হাসবে। তোমরা এমন কঠিন কাজে হাত দিলে কেন? আর কেউতো এগুলো নিয়ে ভাবছে না।

আবীর ভাবে,  এর জবাব আসলে কি? সে কি আসলেই দায়িত্বটা এড়িয়ে যেতে পারতো না?  বাকিদের মত চুপচাপ আরামের জিন্দেগীতে অবগাহন।  কিন্তু বাবার তেজোদীপ্ত কন্ঠে নজরুলের কবিতা তাকে ঘুমাতে গেলেও তাড়া করে,  

আমরা চাহিনা তরল স্বপন, হালকা সুখ 

আরাম কুশন, মখমল চটি, পানসে থুক

শান্তির বাণী, জ্ঞান বানিয়ার বই গুদাম

ছেঁদো ছন্দের পলকা ঊর্ণা, সস্তা নাম 

পঁচা দৌলত, দু পায়ে দল!

কঠোর দুখের তাপস দল 

জোর কদম চলরে চল।

– চারদিকে অন্ধকার নেমে আসছে রে বোন, যদি আলোর মশাল নিয়ে কেউ না বেরোয়, তবে এ আঁধার গিলে খাবে আমাদের সবাইকে।
– হ্যা ভাই, তোমাদের জন্য দোয়া করি। মনে আছে ‘বিপ্লবের ইশতেহার’ – এর সেই লাইনগুলি?

অন্ধকার যত ঘনীভূত হয় ততই উজ্জ্বল হয় বিপ্লবের সম্ভাবনা 

একটি কৃষ্ণ অন্ধকার মানেই 

সামনে অপেক্ষমান একটি প্রস্ফুটিত সূর্যোদয় 

একটি আরক্ত সন্ধ্যা মানেই 

বেগমান বোরাক চেপে ধেয়ে আসছে কোন কুসুম সকাল

একটি কৃষ্ণ মধ্যরাত মানেই 

তার উলটো পিঠে বসে আছে কোন মৌমাছি দুপুর 

একটি অবাধ্য সমাজ মানেই 

সামনে নূহের প্লাবন, অনাগত ধ্বংস 

আরেকটি নতুন সভ্যতার আমূল উদ্বোধন!

মায়ের ডাক শোনা যায়, ” কবিতার কীটেরা, নাশতা খেয়ে আমাকে উদ্ধার করো দ্রুত। ” খোলা দরজা দিয়ে তাকিয়ে আবিরের মনটা আনন্দে ভরে উঠে,  টেবিলে সাজিয়ে রাখা ভাপা পিঠাগুলো থেকে ধোয়া উঠছে তখনো।  পিঠাপুলির দিন চলে এসেছে তাহলে..